ঢাকা ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিকুঞ্জ-১-এ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে স্কুলছাত্র, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

নিকুঞ্জ-১-এ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে স্কুলছাত্র, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা মহানগরীর অন্যতম অভিজাত, পরিকল্পিত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসিক এলাকা নিকুঞ্জ-১-এ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনতাসির রহমান তাহমিদ। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে নিকুঞ্জ-১ এর লেক ড্রাইভ সড়কে এ ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর মডেল আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় রয়েছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রবেশপথে কড়া নজরদারি, নিজস্ব সিকিউরিটি টিম এবং অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। সমাজের প্রথম সারির নাগরিক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ভিআইপিদের বসবাসের কারণে নিকুঞ্জ-১ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ আবাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।

তবে সেই নিকুঞ্জ-১ এই প্রথম এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক ঘটনার সাক্ষী হলো, যা এলাকাবাসীর মধ্যে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

পারিবারিক সূত্র ও প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে মুনতাসির রহমান তাহমিদ প্রতিদিনের মতো নিকুঞ্জ-১ এর লেক ড্রাইভ সড়ক ধরে হাঁটছিল। ওই সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাহমিদের কাছে এসে তার নাকের ওপর টিস্যু পেপারের মতো দেখতে কোনো একটি বস্তু চেপে ধরে। মুহূর্তের মধ্যেই কিশোরটি অচেতন হয়ে পড়ে।

এরপর তার আর কিছু মনে নেই। প্রায় ৪০ মিনিট পর তাহমিদ নিজেকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে আবিষ্কার করে। পরে আশপাশের লোকজনের সহায়তায় সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

ঘটনাটি জানাজানি হতেই নিকুঞ্জ-১ আবাসিক এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যে এলাকা ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা—সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন স্কুলপড়ুয়া কিশোর কিভাবে এমন ঘটনার শিকার হলো, তা নিয়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিকুঞ্জ-১ এলাকায় প্রতিদিন বিকেলবেলা শিশু-কিশোরদের হাঁটাহাঁটি ও খেলাধুলা করতে দেখা যায়। ঠিক সেই সময়েই এ ধরনের ঘটনা ঘটায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে এলাকায় অজ্ঞান পার্টিসহ অপরাধী চক্রের অনুপ্রবেশের ইঙ্গিতও হতে পারে।

ঘটনার পরপরই তাহমিদের পরিবার বিষয়টি স্থানীয় খিলক্ষেত থানায় অবহিত করে এবং নিকুঞ্জ-১ সোসাইটিকেও বিস্তারিত জানায়। খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে এসআই মাহফুজসহ থানার একটি চৌকস পুলিশ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিদর্শন করে। এসময় নিকুঞ্জ-১ এ দায়িত্বে থাকা একাধিক নিরাপত্তাকর্মী পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে আরো উপস্থিত ছিলেন নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা, এলাকার আলোচিত সমাজকর্মী ও সিনিয়র সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল। তিনি ঘটনাটি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্থানীয় বাস্তবতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

পুলিশ কিশোর তাহমিদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করে এবং আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনাস্থলের আশপাশের একাধিক বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার কাজ চলছিল। এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলো বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে তথাকথিত ‘অজ্ঞান পার্টি’র কাজ বলে ধারণা করা হলেও, অন্য কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্য বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিকুঞ্জ-১-এ এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেরই প্রশ্ন, ‘যদি নিকুঞ্জ-১ এর মতো অভিজাত ও সুরক্ষিত এলাকায় শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোর অবস্থা কী?’

এ ঘটনার পর এলাকায় দিন ও রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করার দাবি উঠেছে। বাসিন্দারা সোসাইটি কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি, নিয়মিত পুলিশ টহল বৃদ্ধি এবং সিসিটিভি নজরদারি আরো কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত নিকুঞ্জ-১-এ প্রকাশ্য দিবালোকে স্কুলছাত্র অচেতন হওয়ার ঘটনাটি রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

নিকুঞ্জ-১-এ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে স্কুলছাত্র, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১১:৫০:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা মহানগরীর অন্যতম অভিজাত, পরিকল্পিত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসিক এলাকা নিকুঞ্জ-১-এ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনতাসির রহমান তাহমিদ। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে নিকুঞ্জ-১ এর লেক ড্রাইভ সড়কে এ ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর মডেল আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় রয়েছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রবেশপথে কড়া নজরদারি, নিজস্ব সিকিউরিটি টিম এবং অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। সমাজের প্রথম সারির নাগরিক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ভিআইপিদের বসবাসের কারণে নিকুঞ্জ-১ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ আবাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।

তবে সেই নিকুঞ্জ-১ এই প্রথম এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক ঘটনার সাক্ষী হলো, যা এলাকাবাসীর মধ্যে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

পারিবারিক সূত্র ও প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে মুনতাসির রহমান তাহমিদ প্রতিদিনের মতো নিকুঞ্জ-১ এর লেক ড্রাইভ সড়ক ধরে হাঁটছিল। ওই সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাহমিদের কাছে এসে তার নাকের ওপর টিস্যু পেপারের মতো দেখতে কোনো একটি বস্তু চেপে ধরে। মুহূর্তের মধ্যেই কিশোরটি অচেতন হয়ে পড়ে।

এরপর তার আর কিছু মনে নেই। প্রায় ৪০ মিনিট পর তাহমিদ নিজেকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে আবিষ্কার করে। পরে আশপাশের লোকজনের সহায়তায় সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

ঘটনাটি জানাজানি হতেই নিকুঞ্জ-১ আবাসিক এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যে এলাকা ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা—সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন স্কুলপড়ুয়া কিশোর কিভাবে এমন ঘটনার শিকার হলো, তা নিয়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিকুঞ্জ-১ এলাকায় প্রতিদিন বিকেলবেলা শিশু-কিশোরদের হাঁটাহাঁটি ও খেলাধুলা করতে দেখা যায়। ঠিক সেই সময়েই এ ধরনের ঘটনা ঘটায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে এলাকায় অজ্ঞান পার্টিসহ অপরাধী চক্রের অনুপ্রবেশের ইঙ্গিতও হতে পারে।

ঘটনার পরপরই তাহমিদের পরিবার বিষয়টি স্থানীয় খিলক্ষেত থানায় অবহিত করে এবং নিকুঞ্জ-১ সোসাইটিকেও বিস্তারিত জানায়। খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে এসআই মাহফুজসহ থানার একটি চৌকস পুলিশ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিদর্শন করে। এসময় নিকুঞ্জ-১ এ দায়িত্বে থাকা একাধিক নিরাপত্তাকর্মী পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে আরো উপস্থিত ছিলেন নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা, এলাকার আলোচিত সমাজকর্মী ও সিনিয়র সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল। তিনি ঘটনাটি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্থানীয় বাস্তবতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

পুলিশ কিশোর তাহমিদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করে এবং আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনাস্থলের আশপাশের একাধিক বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার কাজ চলছিল। এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলো বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে তথাকথিত ‘অজ্ঞান পার্টি’র কাজ বলে ধারণা করা হলেও, অন্য কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্য বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিকুঞ্জ-১-এ এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেরই প্রশ্ন, ‘যদি নিকুঞ্জ-১ এর মতো অভিজাত ও সুরক্ষিত এলাকায় শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোর অবস্থা কী?’

এ ঘটনার পর এলাকায় দিন ও রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করার দাবি উঠেছে। বাসিন্দারা সোসাইটি কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি, নিয়মিত পুলিশ টহল বৃদ্ধি এবং সিসিটিভি নজরদারি আরো কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত নিকুঞ্জ-১-এ প্রকাশ্য দিবালোকে স্কুলছাত্র অচেতন হওয়ার ঘটনাটি রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।