নীরব মরুপ্রান্তর। হুদাইবিয়া প্রান্তরের সেই দিনের রোদের অবস্থাও এমন যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরাচ্ছে। দীর্ঘ পথচলা, ক্লান্ত দেহ, আর শুকনো কণ্ঠে সাহাবিদের একটাই অভিযোগ; তীব্র পিপাসা। চারদিকে কোথাও পানির চিহ্ন নেই।
শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে থাকা একটি চামড়ার পাত্রে সামান্য কিছু পানি রয়েছে। সেটুকুই ভরসা, কারণ এতগুলো মানুষের মধ্যে আর কারো কাছে পানি নেই।
সেই কাফেলায় থাকা বিখ্যাত সাহাবি জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু স্মরণ করেন, সে মুহূর্তে সাহাবিদের চোখ গিয়ে থামল নবীজির চামড়ার পানির থলের দিকে। তিনি তখন সেই চর্মপাত্রের পানি দিয়ে শান্তভাবে অজু করছিলেন।
অজু শেষ হতেই চারদিক থেকে লোকেরা এগিয়ে এলো; আস্তে আস্তে নবীজির চারপাশের জটলা ঘন হতে থাকল। সবার চোখে উৎকণ্ঠা, কণ্ঠে অসহায়ত্ব। কারণ নামাজের জন্য অজু করতে হবে; ঝাঁজালো রোদে গলা শুকিয়েছে অনেক আগেই।
দয়ার নবী (সা.) তাদের দিকে তাকিয়ে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমাদের কী হয়েছে?”
সাহাবিরা বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন,
“হে আল্লাহর রাসুল! আপনার এই চর্মপাত্রের পানি ছাড়া আমাদের কাছে আর কোনো পানি নেই; না অজুর জন্য, না পান করার জন্য।
মুহূর্তটি যেন থমকে গেল। মরুভূমির নীরবতা ভেদ করে শুধু শোনা যাচ্ছিল শুষ্ক বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। ঠিক তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই চামড়ার পাত্রের দিকে হাত বাড়ালেন। তাঁর পবিত্র হাত পাত্রে রাখা মাত্রই এক আশ্চর্য দৃশ্য—যেন আঙুলগুলোর ফাঁক গলে গলে ঝরনার মতো পানি উথলে উঠতে লাগল!
জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। আঙুল বেয়ে প্রবাহিত সেই পানি ছিল স্বচ্ছ, প্রশান্ত, অফুরন্ত।
সাহাবিরা একে একে এগিয়ে এসে সেই পানি পান করলেন, অজু করলেন। পিপাসায় শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে ফিরে এলো সজীবতা, ক্লান্ত মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির আলো।
অথচ পানি যেন শেষই হচ্ছিল না।
হাদিসের বর্ণনাকারীদের মধ্য থেকে এক বর্ণনাকারী সালিম জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“সেদিন আপনারা কতজন ছিলেন?”
জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন,
“আমরা যদি এক লক্ষও হতাম, তবুও এই পানিই আমাদের জন্য যথেষ্ট হতো। আমরা ছিলাম পনেরশত জন।”
হুদাইবিয়ার সেই প্রান্তরে; পাথর আর বালুর মাঝে সেদিন সাহাবিরা শুধু পানি পান করেননি; তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন নবুয়তের এক জীবন্ত নিদর্শন। আঙুল বেয়ে ঝরে পড়া সেই পানি আজও ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং ঈমানের গভীরে প্রবহমান।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যোগ্য উম্মত হয়ে দুনিয়ার জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।
[সহিহ বুখারির ৩৫৭৯ নম্বর হাদিসের গল্পরূপ]
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
অনলাইন ডেস্ক 

























